- মোশাররফ হোসেন, রাজারহাট(কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
- ১২ অক্টোবর, ২০২৩

কুড়িগ্রামঃ কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নয়ের চান্দামারি ও কৈলাশকুটি পদ্মবিলে গত দু’বছর ধরে ফুটছে না শাপলা কিংবা পদ্মের কুড়ি। বিলে নেই কোনো পদ্মপাতা কিংবা ফুলের সমাহার। বিলের জলে এখন ছেয়ে গেছে বিষাদের কচুরিপানায়।
দুই বছর আগেও যে বিল দুটি ছিল প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণবিলাসী মানুষের প্রিয় স্থান। নৈঃস্বর্গিক এ বিল দুটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসতো এখানে। বর্তমানে স্থানীয় মানুষের জন্য হতাশার বিলে পরিণত হয়েছে।
বিলের পদ্ম ও শাপলাকে ঘিরে শ্রমজীবী নিম্ন আয়ের মানুষের অর্থ উপার্জনের মাধ্যম গড়ে উঠেছিল বেশ ভালোই। অথচ গত দুই বছর ধরে বিল জুড়ে চলছে কচুরিপানার রাজত্ব। ফলে সব শ্রেণির মানুষের কাছে পদ্মবিলটি এখন বিষোদগারে পরিণত হয়েছে। বিলটির এমন নিষ্ক্রিয়তায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও চান্দামারির বাসিন্দা নুসরাত জাহান বলেন আমাদের বাড়ির পাশে পদ্মবিল হওয়ায় ফুলের মৌসুমে অনেক আনন্দ করতাম। আমার দূরের বান্ধবীরা ঘুরতে আসতো এখানে। নৌকায় চড়ে বিলের মাঝে গিয়ে ছবি তুলতাম, খুব আনন্দ হতো। এসময় সে তার ফোনে থাকা ছবিগুলো দেখিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। এ শিক্ষার্থী প্রকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের পদ্মবিলটি পুনরায় ফুলে ফুলে ভরে তুলতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দাবি করেন।
প্রায় শত একর জুড়ে বিলে প্রতি বছর পদ্ম ফুল ফুটতো। পদ্মবিলে নেমে পদ্ম ফুল তুলতে ও কিনতে ফুল অনুরাগীদের বিচরণ ছিল দেখার মতো। কেউ প্রিয়জনকে উপহার দিতে পদ্ম ফুল কিনতেন। কেউ শালুক কিনতেন কেউবা পূর্জা অর্চনার জন্য পদ্মপাতা কিনতেন।
পদ্মবিল ঘিরে সকাল-সন্ধ্যা এখানে জমিয়ে আড্ডা দিতো অনেকেই। আবার অনেকে পরিবার পরিজন নিয়ে ডিঙি নৌকায় করে পদ্ম বিলের মাঝে গিয়ে ছবি তুলে অবসর সময় কাটাতেন। অথচ গত দু’বছর ধরে সেই পদ্মবিল হয়ে আছে নিষ্প্রাণ। নেই ফুলের বাহার, নেই ডিঙি নৌকার বহর, নেই দর্শনার্থীর ভিড়ও। বিলের জলে এখন আগাছা আর কচুরিপানার বসবাস। বর্ষার শুরু থেকে আশায় দিন গুণা মানুষগুলোর কাছে পদ্মবিলটি এখন মরা গাঙে পরিণত হয়েছে।
চান্দামারি পদ্মবিলের পাশের বাসিন্দা আবুল হাসেমের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, গত দুই বছর ধরে কি কারণে এই বিলে আর পদ্ম ফুল হচ্ছে না তা কেউ জানিনা। অথচ এই পদ্মবিলকে ঘিরে এখানকার শতাধিক মানুষ উপার্জন করতো। পদ্মবিল দেখতে কুড়িগ্রামের মানুষ ছাড়াও রংপুর, লালমনিরহাটের মানুষ পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসতো। বিলটিকে পুণরায় সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
বিলের পদ্ম ফুল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা মো. মনসুর আলী বলেন, গত দুই বছর ধরে এই পদ্মবিলে ফুল ফোটাতো দূরের কথা পদ্মের পাতাও চোখে পড়ে না তেমন। প্রতি বছর বন্যার পরে আমন আবাদের কাজ শেষে আমরা বেকার থাকতাম। এই সময়ে অনেকে পদ্মপাতা, শাপলা ফুল, পদ্ম ফুল ও শালুক তুলে বিক্রি করে সংসার চালাতাম। এখন পদ্মবিলে ফুল না থাকায় আমাদের উপার্জন বন্ধ।
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মির্জা নাসির উদ্দীন (প্রাণি ও উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ) বলেন, রাজারহাট উপজেলার পদ্মবিলটি জেলার মানুষের কাছে খুবই পরিচিত ছিল। বিলটিকে ঘিরে দর্শনার্থীর ভিড় ছিল। অথচ গত দু’বছর ধরে বিলটিতে পদ্ম ফুল চোখে পড়ছে না। তবে এর কারণ হিসেবে বিলে সময়মতো পানি না থাকা ও স্থানীয়দের শালুক (বীজ) তুলে বিক্রি করাকে দায়ী করছেন তিনি। এছাড়া আশপাশের আবাদি জমিতে রসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের কারণে বিল দুটিতে প্রভাব পড়তে পারে।
রাজারহাট উপজেলা কৃষি অফিসার মোছাঃ সাইফুন্নাহার সাথীর সাথে এবিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন- পদ্মবিলে বোরো মৌসুমে ধান চাষ করা হয়ে থাকে। তাই বোরো চাষাবাদের সময় কৃষক আগাছা দমনে ব্যবহৃত কীটনাশক প্রয়োগে পদ্মের পঁচন ধরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও প্রতিবছর সমানভাবে পদ্মফুল না গজানোর বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাই।
এম এইচ/রা/কু
