ষ্টাফ রিপোর্টার
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩

দেশে খাদ্যপণ্যের দামসহ জীবনধারণের খরচ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। গত আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশে। এর মধ্যে রেকর্ড বেড়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। গত মাসে এর হার ছিল ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা জুলাইয়ের চেয়ে বেড়েছে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্ববাজারে যদিও খাদ্যপণ্যের দাম কমছে প্রতিনিয়ত। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য বলছে, বৈশ্বিক খাদ্য মূল্য সূচক আগস্টে গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে।
আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে রেকর্ড হারে, ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা গত ১১ বছর ৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এর আগে ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল। প্রায় ১২ বছরের মধ্যে আগস্টে হঠাৎ খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রথমবারের মতো দুই অঙ্কের ঘরে উঠে যায়।
চলতি বছরের প্রথম দিকেও খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রবণতা নিম্নগামী ছিল। জানুয়ারিতে এ হার দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭৬ শতাংশে। তবে ফেব্রুয়ারি থেকে আবার তা বাড়তে শুরু করে। বছরের দ্বিতীয় মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং তৃতীয় মাস মার্চে ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। আবার এপ্রিলে এ হার কিছুটা কমলেও মে মাস থেকে আবার বাড়তে শুরু করে। মে ও জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার গিয়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৯ দশমিক ২৪ ও ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে।
সরকারের যদিও প্রত্যাশা ছিল আগস্টে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমবে। গত ২৯ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভার পর পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘মূল্যস্ফীতি জোর করে কমানো যায় না। কার্যকর নীতি নিতে হবে। আমি ঝুঁকি নিয়ে বলতে পারি, চলতি আগস্টে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসবে।’ তবে আগস্টে সে হার উল্টো বেড়েছে। এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রীর বক্তব্য জানতে তার সেলফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. আব্দুল লতিফ মন্ডল বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবেই আগস্ট থেকে অক্টোবর—এ তিন মাস খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। কারণ এ সময় মাঠে ফসল থাকে না। খাদ্যপণ্যের দামও বেড়ে যায়।’
এদিকে দেশের বাজারে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বাড়লেও বিশ্ববাজারে ক্রমেই কমছে খাদ্য মূল্য সূচক। এফএওর ‘ফুড প্রাইস ইনডেক্স’ অনুযায়ী, ২০২০ সালে বৈশ্বিক খাদ্য মূল্য সূচক ছিল ৯৮ দশমিক ১ পয়েন্ট। সেটা ২০২১ সালে বেড়ে হয় ১২৫ দশমিক ৭ পয়েন্ট। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে তা আরো বেড়ে ১৪৩ দশমিক ৭ পয়েন্টে দাঁড়ায়। যদিও চলতি বছরের আগস্টে বৈশ্বিক খাদ্য মূল্য সূচক কমে ১২১ দশমিক ৪ পয়েন্টে নেমেছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২২ সালের আগস্টেও এ সূচক ছিল ১৩৭ দশমিক ৬ পয়েন্ট। সে হিসাবে গত এক বছরে খাদ্য মূল্য সূচক কমেছে ১৬ দশমিক ২ পয়েন্ট।
সাবেক সচিব মো. আব্দুল লতিফ মন্ডল বলেন, ‘বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম কমে আসছে। অথচ আমাদের দেশে চিত্র পুরো উল্টো। শ্রীলংকা এত খারাপ অবস্থায় ছিল, তারা এখন পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক সংকটের দোহাই দেয়া হয়, তাহলে অন্যরা কীভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে? আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে মূলত প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া। আর টাকার মান কমে যাচ্ছে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স কমে যাওয়া এবং রফতানির আড়ালে টাকা পাচারের কারণে। সার্বিকভাবে তাই সবকিছুর দাম বেড়ে যাচ্ছে। এসব জায়গায় সরকারকে নজর দিতে হবে।’
দুগ্ধজাত পণ্য, তেলবীজ, মাংস, দানাজাতীয় খাদ্যপণ্যসহ প্রায় সব ধরনের খাবারের দামই কমেছে বিশ্ববাজারে। যদিও চাল রফতানিতে ভারতের বিধিনিষেধের কারণে পণ্যটির দাম বেড়েছে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেনের শস্যচুক্তি বাতিল হলেও গম বা ভুট্টার বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। পণ্যবাজারের মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত মাসিক প্রতিবেদনের (পিংকশিট) সেপ্টেম্বর সংস্করণের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১ হাজার ৮৮৭ ডলার। কিন্তু গত আগস্টে তা ১ হাজার ১২৭ ডলারে নামে। ২০২২ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রতি টন ভুট্টার দাম ছিল ৩৪২ ডলার। যদিও গত আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ২০৭ ডলারে। গত বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রতি টন গমের দাম ছিল ৪৯২ ডলার। গত মাসে তা ৩১৫ ডলারে নেমেছে।
বাংলাদেশের বাজারে অবশ্য এর প্রভাব পড়তে দেখা যায়নি। উল্টো বেড়েই চলেছে সব নিত্যপণ্যের দাম। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ৪৮-৫০ টাকা। এছাড়া প্রতি কেজি খোলা আটা ৪৫-৫০ টাকা, দেশী পেঁয়াজ ৮০-৯০, আলু ৪২-৪৫, চিনি ১৩০-১৩৫, সয়াবিন তেলের লিটার ১৫৫-১৬০, ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৭৫-১৮০ এবং গরুর মাংস ৭৫০-৭৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর এক হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫৩ টাকায়। অথচ ২০২১ সালের আগস্টে প্রতি কেজি চাল ৪৫-৫০ টাকা, প্রতি কেজি খোলা আটা ৩০-৩৩, দেশী পেঁয়াজ ৪২-৪৫, আলু ১৮-২২, চিনি ৭৫-৮০, সয়াবিন তেল ১২৬-১৩০, ব্রয়লার মুরগি ১৩০-১৪০ এবং গরুর মাংসের দাম ছিল ৫৮০-৬০০ টাকা। প্রতি হালি ডিম বিক্রি হয়েছে ৩৫-৩৭ টাকায়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ।
জানতে চাইলে কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারে সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায়। কিন্তু দাম কমলে দেশের বাজারে তা আর কমে না। এটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোর এক্ষেত্রে তদারকির অভাব রয়েছে। আবার যেসব পণ্য আমদানি করতে হয় সেক্ষেত্রে ট্যারিফ কমিশন থেকে চিনি, সয়াবিন তেল ও গমসহ সাতটি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এটা তারা অ্যানালাইসিস করে নির্ধারণ করে। এ সিদ্ধান্ত ট্যারিফ কমিশন এবং আমদানিকারকরা মিলে নেন। কিন্তু আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম এতে বাইরের প্রতিনিধি রাখার জন্য। এক্ষেত্রে ভোক্তা ও গণমাধ্যম থেকে প্রতিনিধি রাখা যেতে পারে। তাহলে বোঝা যেত কীসের ভিত্তিতে এ দাম নির্ধারণ করা হয়।’
