🚹 স্টাফ রিপোর্টার
🗓️০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩,

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টম হাউজের লকার থেকে ৫৫ দশমিক ৫১ কেজি স্বর্ণ গায়েব হয়ে গেছে। যার আনুমানিক মূল্য সাড়ে ৫৫ কোটি টাকার বেশি। এ স্বর্ণের মধ্যে বার ও অলংকার রয়েছে। গায়েব হওয়া স্বর্ণ কাস্টমস গুদামের একটি আলমারিতে বাক্সের মধ্যে সংরক্ষিত ছিল। সেই বাক্সটিই চুরি হয়ে গেছে। কাস্টমসের গুদামের আলমারি ভেঙে চুরি করা হয়েছে বাক্সটি। এ ঘটনায় চার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন কাস্টম কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে রোববার গভীর রাতে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি করেছেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন।
এছাড়া বিষয়টি তদন্তের জন্য একজন যুগ্ম কমিশনারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রোববার বিকালে ঢাকা কাস্টম হাউজের কমিশনার নূরুল হুদা আজাদ যুগান্তরকে বলেন, তিন বছরে (২০২০ থেকে ২০২৩ সাল) গুদামে জমাকৃত স্বর্ণ ইনভেন্ট্রি (জিনিসপত্রের তালিকা) করে ৫৫ কেজির মতো স্বর্ণের হিসাব পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন একটি চক্র এ কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হঠাৎ কেন ইনভেন্ট্রি করা হলো-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের বদলি কাস্টমসের নিয়মিত প্রক্রিয়া। সম্প্রতি গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্তদের বদলির পরও চাবি বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন না সংশ্লিষ্টরা। তখন সন্দেহ হয়। এ কারণে ইনভেন্ট্রি করার পর বিষয়টি জানা গেছে।
এদিন রাত সাড়ে ১০টায় কাস্টমস কমিশনার বলেন, আমরা যাদের চিহ্নিত করেছি তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যারা এখনো চিহ্নিত হয়নি তাদের শনাক্ত করতে যুগ্ম কমিশনার মিনহাজ উদ্দীনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, চুরির ঘটনায় প্রাথমিকভাবে যাদের শনাক্ত করেছি তাদের মধ্যে সহকারী রাজস্ব পদমর্যাদার চার কর্মকর্তা আছেন। এছাড়া সিপাহী পদমর্যাদার কয়েকজন আছে। জড়িতদের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবার নাম এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। তবে চার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হলেন-শহিদ, শাহেদ, আকরাম ও মাসুম।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ বলেন, বিমানবন্দরের মতো কেপিআই এলাকায় বাইরের কোনো লোকের ছাদ পর্যন্ত পৌঁছানো সন্দেহজনক। বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর জায়গার ভল্ট থেকে স্বর্ণ চুরি হওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এসব ঘটনা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত।
জানা যায়, বিমানবন্দরের ভেতর ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ অর্থাৎ হারিয়ে যাওয়া ও খুঁজে পাওয়া পণ্য রাখার স্থানের পাশেই কাস্টমসের গুদাম। কাস্টম হাউজের গুদামটিতে বিমানবন্দরে কর্তব্যরত ঢাকা কাস্টম হাউজ, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরসহ অন্য সংস্থাগুলোর জব্দকৃত মালামাল রাখা হয়। স্বর্ণ চুরির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই ঢাকা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরে কাস্টমসের গুদামে রক্ষিত সব স্বর্ণালংকার ও স্বর্ণের বারের হিসাব করছে। হিসাব শেষে চুরি হওয়া স্বর্ণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
ঢাকা কাস্টম হাউজের যুগ্ম কমিশনার ইমতিয়াজ হাসান বলেন, চোর আটক এবং স্বর্ণ গায়েব-দুটি পৃথক ঘটনা। চোর আটকের বিষয়ে কাস্টমসের কোনো বিষয় জড়িত না। এপিবিএন সদস্যরা তাকে আটক করেছে। তবে স্বর্ণ গায়েবের বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। সুরক্ষিত জায়গা থেকে কারা বিপুল পরিমাণ এ স্বর্ণ চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে সে বিষয়ে আমাদের কাজ চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য ইউনিটগুলোও এ নিয়ে তদন্ত করছে।
বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা জানান, কাস্টম হাউজ থেকে চুরির ঘটনায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টসহ (সিআইডি) একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। থানা পুলিশ, বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নসহ (এপিবিএন) অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন তদন্ত শুরু করেছেন।
এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিয়াউল হক পলাশ বলেন, চোর গ্রেফতারের বিষয়টি বেশ কয়েক দিন আগের। এটিকে আমরা বড় কোনো গ্রেফতার মনে করিনি। তাই মিডিয়াকে জানানো হয়নি। চোরচক্রের সদস্যরা এয়ারপোর্টে প্রবেশের পরই আমাদের গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য আসে। এরপর এপিবিএন সদস্যরা অভিযান চালান। তখন দুজন পালিয়ে যায়। আমরা একজনকে গ্রেফতার করি। ঘটনার পরপরই এটি নিয়ে মামলা হয়। মামলার তদন্ত চলছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্বর্ণ চুরির বিষয়ে এখনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। কাস্টম হাউজের লোকজন হিসাবনিকাশ করছেন। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানালে আমরা সেটি নিয়ে কাজ করব।
এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ জানায়, রোববার দুপুরের দিকে ভল্ট থেকে স্বর্ণ চুরির বিষয়টি জানাজানি হয়। পুলিশের দাবি, এটি কোনো সাধারণ ভল্ট নয়। সাধারণ কোনো ব্যক্তি বা চোরের চুরি করা সম্ভব নয়। এছাড়া এটি সম্পূর্ণ সংরক্ষিত এলাকা। পুরো এলাকাটি সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে।
বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজিজুল হক মিঞা বলেন, প্রাথমিকভাবে যাদের জড়িত বলে মনে হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তদন্তের পরই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।
জানা যায়, ৩১ জুলাই রাত ১২টার পর বিমানবন্দরের ১ নম্বর টার্মিনালের লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড রুমের ছাদে উঠে পড়ে চোর। পরে ভেন্টিলেটরের অংশ ভেঙে ঢুকে পড়ে ভেতরে। কিন্তু চুরির মালামাল নিয়ে বের হওয়ার পথ না পাওয়ায় আটকা পড়ে ভেতরে। পরদিন বিমানবন্দরের কর্মীরা দায়িত্ব পালনের জন্য সেখানে গেলে দেখতে পান চোরকে। এরপর তাকে তুলে দেওয়া হয় পুলিশের হাতে। গ্রেফতার রানার বাড়ি মুন্সীগঞ্জে।
এ ঘটনায় দুই সহযোগীসহ তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে ডিএমপির এয়ারপোর্ট জোন অতিরিক্ত উপকমিশনার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, রানা ভেতরে ঢুকলেও তার দুই সহযোগী ছাদেই অপেক্ষা করছিল চুরির মালামাল নেওয়ার জন্য। পরে রানা বের হতে না পারায় পালিয়ে যায় তারা। এ ঘটনায় বিমানবন্দরের কেউ জড়িত কি না খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
